ভারত-চীনের হারানো পোশাক অর্ডার ধরার প্রস্তুতি নেই

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আরোপিত উচ্চ হারের পাল্টা শুল্কের কারণে মার্কিন ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ হারাচ্ছে চীন ও ভারত। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ দেখা দিয়েছে। কিন্তু গ্যাস-সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারসহ নানা কারণে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।
ব্যবসায়ীদের বলছেন, এখনো চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার ও চলমান তারল্য সংকট। এসব সমস্যা উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
পোশাক খাতে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে গ্রীষ্ম মৌসুমের ক্রয়াদেশ আসতে শুরু করবে। তখন কারখানাগুলোয় চাপ আরও বাড়বে। এই বাড়তি ক্রয়াদেশ দেশের রপ্তানিকারকেরা নিতে পারবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘অবকাঠামোর উন্নয়ন না হলে বাড়তি অর্ডার নিয়ে পণ্য সাপ্লাই কীভাবে সম্ভব বলেন? এখনকার যে অর্ডার তার সাপ্লাই দিতেই হিমশিম খাচ্ছি আমরা। কারণ, নানা সমস্যায় এখনো ৩০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ এবং পর্যাপ্ত চাপ না পাওয়ার কারণে অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না।’
বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, ‘যদি বাড়তি অর্ডার ধরতে হয়, তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান তো করতেই হবে। এ ছাড়া বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের সুদহার কমানো, ব্যাংকগুলোর তারল্যসংকট দূর করতে হবে। দর-কষাকষির সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এসব সমস্যার সমাধান হলে খুব দ্রুতই রপ্তানি বাড়বে।’
গত ৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বিভিন্ন দেশের পণ্য আমদানির ওপর সংশোধিত পাল্টা শুল্কহার ঘোষণা করে। ৭ আগস্ট থেকে নতুন শুল্কহার কার্যকর হয়েছে। সংশোধিত হার অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের পণ্যে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক দিতে হচ্ছে। আর চীনের ওপর পাল্টা শুল্ক ৩০ শতাংশ রয়েছে। ভারতের ওপর পাল্টা শুল্ক প্রথমে ২৫ শতাংশ থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়, যা ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা বলেছেন, পাল্টা শুল্কের প্রভাবে চীনের হারানো ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসছে। ভারতের হারানো রপ্তানি আদেশও আসতে পারে। ৬-৮ মাস ধরে তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সামনের মৌসুমের জন্য ক্রয়াদেশ দিতে অনেক ক্রেতা ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান চীন ও ভারতে আগের দেওয়া ক্রয়াদেশগুলোর মেয়াদ শেষে হলে নতুন ক্রয়াদেশগুলো বাংলাদেশে দিতে চাইছে। কারণ, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ।
রপ্তানির তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত বছরের প্রথমার্ধের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি ১১১ কোটি ডলার কমেছে।
তবে চীনের এই হারানো অর্ডারগুলোর সব ধরতে পারেনি বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা। বেশির ভাগই গেছে ভিয়েতনামে। তথ্য বলছে, এ সময় ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ১১৯ কোটি ডলার। আর বাংলাদেশের বেড়েছে ৮৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৩৮ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি।
ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের মতে, ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের কারণে শুধু সেপ্টেম্বরেই যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। প্রাথমিক হিসাবে দেশটির বার্ষিক রপ্তানি কমতে পারে ৪ হাজার কোটি ডলার; যার সুবিধা পাবে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও চীন।
বাড়তি রপ্তানি আয় হলে এই অর্থ দিয়ে বাড়তি এলএনজি আমদানি ছাড়াও অন্যান্য সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে জানিয়েছে অনেক রপ্তানিকারক। সেই সঙ্গে গ্যাসের সমস্যা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলেও জানায় তারা। এতে তারা আশার আলোও দেখতে পাচ্ছে। উৎপাদক ও রপ্তানিকারকেরা বলছে, বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ অভাবে ৩০ শতাংশ উৎপাদন কম হচ্ছে। দুই থেকে তিন মাস আগে এই সমস্যা আরও বেশি ছিল। তখন সক্ষমতার ৪০ শতাংশের বেশি উৎপাদন কম হতো।
ব্যাংকঋণের সুদহার বিষয়ে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগে যেখানে এক কোটি টাকায় ব্যাংকের সুদ দিতে হতো ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা; এখন সেখানে দিতে হয় ১৪-১৫ লাখ টাকা। ব্যাংকঋণের এই বাড়তি সুদের চাপ অনেক কারখানাই সামাল দিতে পারছে না, বিশেষ করে ছোট কারখানাগুলো। এ ছাড়া কিছু ব্যাংক রয়েছে সংকটাপন্ন। রপ্তানিকারকদের রপ্তানি মূল্য সময়মতো পরিশোধ করছে না তারা। এমনকি ব্যাংকগুলো নতুন এলসি খুলতেও ব্যর্থ হচ্ছে। বন্দরে প্রায়ই পণ্যের জট লেগে যায়, সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দেওয়া যায় না। রয়েছে কাস্টমস কর্মকর্তাদের অসহযোগিতাও।
এ অবস্থায় নতুন বায়ারদের দেশে ভেড়াতে হলে নেগোশিয়েশন সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। এই দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টি সরকার ও উদ্যোক্তা দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।