ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ, নিহত ৪

নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক জার্নাল আন্তর্জাতিক জার্নাল
প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১১:২৫ AM

ব্যাপক বিক্ষোভের কবলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার সরকার। কম মজুরি ও রাজনীতিবিদদের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের প্রতিবাদ আন্দোলনে পুলিশের গাড়ি চাপায় মৃত্যু হয় রাইড শেয়ারিং গাড়ি চালকের। তার মৃত্যুতে আন্দোলন আরও জোরদার হয়েছে।

আন্দোলনকারীরা পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার একটি কাউন্সিল ভবনে আগুন দিলে ঘটনায় তিনজন মারা গেছেন। রাইড শেয়ারিং গাড়ি চালকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইন্দোনেশিয়া জুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে এ ঘটনা ঘটে। খবর বিবিসির।

২১ বছর বয়সী আফফান কুরনিয়াওয়ান জাকার্তায় এক বিক্ষোভের সময় পুলিশের গাড়িচাপায় নিহত হন। ওই বিক্ষোভ চলছিল কম মজুরি ও রাজনীতিবিদদের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের প্রতিবাদে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

চলমান এই বিক্ষোভকে নতুন প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুক্রবার তিনি কুরনিয়াওয়ানের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমবেদনা জানান।

শনিবার তিনি চীনে সফর বাতিল করেন। সেখানে আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান উপলক্ষে আয়োজিত এক সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। তবে দেশে সহিংস সংঘর্ষ চলতে থাকায় তিনি সফর বাতিল করেছেন।

বিক্ষোভের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক ইন্দোনেশিয়ায় কয়েক দিনের জন্য তাদের লাইভ ফিচার স্থগিত করেছে।

সপ্তাহান্তে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। বিক্ষোভকারীরা জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র বালি'র পুলিশ সদর দপ্তরের সামনেও বিক্ষোভ করে। দেশজুড়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে।

শুক্রবার আফফান কুরনিয়াওয়ানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার সাবেক সহকর্মীরা তাকে শেষ বিদায় জানাতে সঙ্গে ছিলেন।

জানাজায় যোগ দেন জাকার্তার পুলিশ প্রধান আসেপ এদি সুহেরি, রাজনীতিবিদ রিয়ে দ্যাহ পিতালোকার এবং সাবেক গভর্নর আনিস বাসওয়েদান। তারা আশা প্রকাশ করেন, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে। তবে তারা একই সঙ্গে ডেলিভারি রাইডারদের বিক্ষোভ বন্ধ করার আহ্বান জানান, যেন স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

পুলিশ প্রধানও ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

এ সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশ সদর দপ্তরের বাইরে জড়ো হয়ে কুরনিয়াওয়ানের মৃত্যুর ন্যায়বিচারের দাবি জানান।

কুরনিয়াওয়ানের পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোও। তিনি বলেছেন, কর্মকর্তাদের এমন আচরণে তিনি 'স্তম্ভিত ও হতাশ'।

জাকার্তার গভর্নর প্রামোনো আনুং কুরনিয়াওয়ানের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমবেদনা জানান এবং জানাজার খরচের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

শুক্রবার মোবাইল ব্রিগেড কর্পসের (সাতব্রিমব) সাতজন সদস্যকে পুলিশের পেশাগত আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরও বেড়ে যায়, এতে পেরতামিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন।

এর আগে বিক্ষোভকারীরা কাছের একটি ফুটওভার ব্রিজে একটি ব্যানার ঝুলিয়ে দেন, যাতে লেখা ছিল 'অভিশপ্ত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার করো'।

জাকার্তার কেন্দ্রস্থল কুইতাং এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভকারীরা ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় পুলিশ সদর দপ্তরের সামনের সড়কে মিছিল নিয়ে যান। এর আগে মেরিন ও সেনা সদস্যরা তাদের বাধা দিয়েছিল।

পুলিশ সদর দপ্তরের ভেতর থেকে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এ সময় বিক্ষোভকারীরাও একটি পুলিশ কনভয় আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং গাড়িগুলোর দিকে ইটপাটকেল ছোড়ে।

মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেও কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশ কমপাউন্ড লক্ষ্য করে মলোটভ ককটেল ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে, ইন্দোনেশিয়ার কোমপাস (বিবিসির অংশীদার) এ খবর জানিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ডজনখানেক গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

বিক্ষোভ শুধু জাকার্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; জাভা বারাত, সুরাকার্তা, বান্দুং এবং মেদানেও একই ধরনের বিক্ষোভ দেখা গেছে।

কুরনিয়াওয়ানের জানাজার ড্রোনচিত্রে দেখা গেছে, হাজারো রাইডার তার সমর্থনে উপস্থিত হয়েছেন—কেউ হেঁটে, আবার কেউবা তাদের গাড়িতে। অনেকেই ছিলেন তাদের প্রতিষ্ঠান গোজেক-এর সবুজ পোশাকে।

কুরনিয়াওয়ানের মৃত্যুর পর এক বিবৃতিতে গোজেক জানায়, 'প্রতিটি সবুজ জ্যাকেটের পেছনে আছে একটি পরিবার, প্রার্থনা আর সংগ্রাম। আফফান কুরনিয়াওয়ানও সেই যাত্রার অংশ নিয়ে ছিলেন। তার প্রস্থান আমাদের সবার জন্য গভীর বেদনা রেখে গেল।'

কোম্পানিটি আরও জানায়, তারা কুরনিয়াওয়ানের পরিবারকে সহায়তা প্রদান করবে।

সপ্তাহজুড়ে চলা এ বিক্ষোভ শুধু তার মৃত্যুকেন্দ্রিক নয়, বরং আরও নানা ইস্যু নিয়ে।

এর মধ্যে অন্যতম বড় অভিযোগ হলো আইনপ্রণেতাদের জন্য নতুন মাসিক ভাতা। তারা ৫০ মিলিয়ন রুপিয়া (৩ হাজার ৩০ ডলার; ২ হাজার ২৫০ পাউন্ড) পাবেন, যা ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর জাকার্তার ন্যূনতম মজুরির প্রায় ১০ গুণ।

বিক্ষোভকারীরা আরও মজুরি বৃদ্ধি, কর কমানো এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য দাবি জানাচ্ছেন।